চিকিৎসাবিজ্ঞানের এক যুগান্তকারী সাফল্যের সাক্ষী থাকল কলকাতার এসএসকেএম (পিজি) হাসপাতাল। প্রথমবারের মতো পূর্ব ভারতে একজন জীবিত ডোনারের শরীর থেকে সংগৃহীত হাড় একটি শিশুর শরীরে সফলভাবে প্রতিস্থাপন করা হল। এই নজিরবিহীন অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে নতুন জীবন পেল মুর্শিদাবাদের এক নাবালক।
রোগীর সমস্যা ও চ্যালেঞ্জ
মুর্শিদাবাদের বাসিন্দা মহসিন রাজা নামে ওই শিশুটির বাম কাঁধের নিচে একটি জায়ান্ট সেল টিউমার ধরা পড়ে। চিকিৎসকদের মতে, টিউমারটি অপসারণ করলে কাঁধের নিচে প্রায় ১২–১৫ সেন্টিমিটার হাড়ের ঘাটতি তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা ছিল। ফলে শিশুটির ওই অংশ স্থায়ীভাবে অকার্যকর হয়ে যাওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়।
এই জটিল পরিস্থিতিতে চিকিৎসকরা প্রচলিত পদ্ধতির বাইরে গিয়ে নতুন পথের সন্ধান করেন।
অভিনব সমাধান: লিভিং ডোনার বোন ট্রান্সপ্লান্ট
সাধারণত এ ধরনের ক্ষেত্রে রোগীর শরীরের অন্য অংশ থেকে হাড় নিয়ে প্রতিস্থাপন করা হয়, যা ঝুঁকিপূর্ণ এবং শরীরের অন্য অংশে সমস্যা তৈরি করতে পারে।
কিন্তু এই ক্ষেত্রে চিকিৎসকরা ব্যবহার করেন বোন ব্যাংকে সংরক্ষিত এক জীবিত ডোনারের হাড়। এটি পূর্ব ভারতে প্রথম এই ধরনের প্রয়োগ।
অস্ত্রোপচারটি পরিচালনা করেন পিজি হাসপাতালের অর্থোপেডিক বিভাগের প্রধান ডাঃ তন্ময় দত্ত এবং ভিজিটিং অনকো সার্জন ডাঃ কৌশিক নন্দী, তাঁদের অভিজ্ঞ টিমের সহায়তায়।
সফল অস্ত্রোপচার ও বর্তমান অবস্থা
গত ১১ মার্চ এই জটিল অস্ত্রোপচার সম্পন্ন হয়। দুই সপ্তাহ পর চেকআপে দেখা গেছে—
- শিশুর শরীর সফলভাবে ডোনারের হাড় গ্রহণ করতে শুরু করেছে
- কোনো সংক্রমণ বা জটিলতা নেই
- অস্ত্রোপচারের পরবর্তী ব্যথাও কমে গেছে
চিকিৎসকদের মতে, এটি অত্যন্ত ইতিবাচক লক্ষণ এবং ভবিষ্যতে সম্পূর্ণ সুস্থ হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
বোন ব্যাংকের ভূমিকা
এই সাফল্যের পিছনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে পিজি হাসপাতালের বোন ব্যাংক, যা অবস্থিত শম্ভুনাথ পণ্ডিত হাসপাতালের অ্যানেক্স ভবনে।
এখানে লিভিং ডোনারদের হাড় সংরক্ষণ করা হয়—যেমন হাঁটু প্রতিস্থাপনের সময় বাদ দেওয়া হাড়, যা আগে ফেলে দেওয়া হত। এখন সেই হাড় বৈজ্ঞানিক পরীক্ষার মাধ্যমে সংরক্ষণ করে ভবিষ্যতে রোগীদের চিকিৎসায় ব্যবহার করা হচ্ছে।
প্রাথমিকভাবে ২৯টি হাড়ের নমুনা পরীক্ষা করে দেখা হয়েছে, এবং সেগুলি মানবদেহে ব্যবহারের জন্য নিরাপদ বলে প্রমাণিত হয়েছে। বর্তমানে এই বোন ব্যাংক অর্থোপেডিক সার্জারির ক্ষেত্রে রাজ্যকে অনেকটাই স্বনির্ভর করে তুলেছে।
চিকিৎসাবিজ্ঞানে নতুন দিগন্ত
এই সফল অস্ত্রোপচার শুধুমাত্র একটি শিশুর জীবনই বদলে দেয়নি, বরং পূর্ব ভারতের চিকিৎসা ব্যবস্থায় নতুন সম্ভাবনার দরজা খুলে দিয়েছে। ভবিষ্যতে আরও জটিল অস্থি সংক্রান্ত রোগের চিকিৎসায় এই পদ্ধতি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিতে পারে।



