Sleep Deprivation Linked to Aggression and Suicidal Risk in Youth

বিশ্বজুড়ে মানুষের মধ্যে সুস্থ ঘুমের গুরুত্ব সম্পর্কে সচেতনতা বাড়াতে প্রতি বছর পালিত হয় বিশ্ব ঘুম দিবস (World Sleep Day)। ২০২৬ সালের বিশ্ব ঘুম দিবস উপলক্ষে World Sleep Society এবং Calcutta Sleep Society-এর যৌথ উদ্যোগে কলকাতায় আয়োজন করা হয় একটি বিশেষ বৈজ্ঞানিক আলোচনা সভা—“Sleep Well, Live Better”। এই অনুষ্ঠানে ঘুমের গুরুত্ব, ঘুমের অভাবের প্রভাব এবং বিশেষ করে কিশোর-কিশোরীদের মানসিক স্বাস্থ্যের উপর তার প্রভাব নিয়ে বিশদ আলোচনা করা হয়।

অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন স্লিপ মেডিসিন বিশেষজ্ঞ ডাঃ সৌরভ দাস, যিনি কলকাতার Somnos Sleep Clinic-এর সিনিয়র কনসালটেন্ট এবং World Sleep Day-এর আঞ্চলিক সমন্বয়কারী। এছাড়াও উপস্থিত ছিলেন ডাঃ উত্তম আগরওয়াল, Calcutta Sleep Society-এর সভাপতি এবং Orange Sleep Apnea Clinic-এর স্লিপ অ্যাপনিয়া ও ইএনটি সার্জন।

ঘুম কেন এত গুরুত্বপূর্ণ?

বিশেষজ্ঞদের মতে, ঘুম মানুষের শরীরের একটি মৌলিক জৈবিক প্রক্রিয়া। এটি মস্তিষ্কের বিকাশ, আবেগ নিয়ন্ত্রণ, স্মৃতিশক্তি ও মানসিক স্থিতি বজায় রাখতে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। সাধারণভাবে প্রি-টিন, কিশোর ও তরুণদের প্রতিদিন ৮–১০ ঘণ্টা ঘুম প্রয়োজন।

কিন্তু বর্তমান সময়ে ঘুমের ঘাটতি একটি বড় বৈশ্বিক সমস্যা হয়ে উঠেছে। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সমীক্ষা বলছে, প্রায় ৬০–৭০ শতাংশ কিশোর-কিশোরী প্রয়োজনের তুলনায় কম ঘুমায়। যুক্তরাষ্ট্রের একটি সমীক্ষায় দেখা গেছে, প্রায় ৭৩ শতাংশ হাইস্কুল ছাত্রছাত্রী স্কুলের দিনে ৮ ঘণ্টার কম ঘুম পায়

কেন কমে যাচ্ছে ঘুম?

বিশেষজ্ঞরা ঘুমের ঘাটতির পিছনে কয়েকটি প্রধান কারণ উল্লেখ করেছেন—

  • অতিরিক্ত পড়াশোনার চাপ

  • স্মার্টফোন ও ডিজিটাল মিডিয়ার অতিরিক্ত ব্যবহার

  • বয়ঃসন্ধিকালে শরীরের ঘড়ির পরিবর্তন

  • খুব সকালে স্কুল শুরু হওয়া

ঘুমের অভাবের মানসিক প্রভাব

কিশোর বয়সে মস্তিষ্ক দ্রুত বিকশিত হয়। বিশেষ করে আবেগ নিয়ন্ত্রণ এবং সিদ্ধান্ত নেওয়ার সঙ্গে যুক্ত মস্তিষ্কের অংশগুলির বিকাশ এই সময়েই ঘটে। গবেষণায় দেখা গেছে, ঘুমের অভাব মস্তিষ্কের আবেগ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থাকে উল্লেখযোগ্যভাবে প্রভাবিত করে।

ঘুম কম হলে নেতিবাচক আবেগের প্রতি মস্তিষ্কের প্রতিক্রিয়া প্রায় ৬০ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধি পেতে পারে, ফলে রাগ, হতাশা ও আবেগের অস্থিরতা বেড়ে যায়। এর ফলে কিশোরদের আচরণে আক্রমণাত্মকতা এবং হঠাৎ আবেগপ্রবণ প্রতিক্রিয়া দেখা দিতে পারে।

আক্রমণাত্মক আচরণ ও আত্মহত্যার ঝুঁকি

বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, যারা প্রতিদিন ৭ ঘণ্টার কম ঘুমায়, তাদের মধ্যে আক্রমণাত্মক আচরণের ঝুঁকি প্রায় ১.৫ থেকে ২ গুণ বেশি। অনেক স্কুলভিত্তিক সমীক্ষায় ঘুমের অভাবে শারীরিক ঝগড়া ও বুলিংয়ের ঘটনা ৩০–৪০ শতাংশ বেশি পাওয়া গেছে।

ঘুমের সমস্যার সঙ্গে আত্মহত্যাপ্রবণ চিন্তারও শক্তিশালী সম্পর্ক রয়েছে। একটি বড় আন্তর্জাতিক বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ঘুমের সমস্যায় ভোগা মানুষের মধ্যে আত্মহত্যার চিন্তা বা চেষ্টা করার ঝুঁকি ২ থেকে ৩ গুণ বেশি

ভারতের প্রেক্ষাপট

ভারতেও কিশোরদের মধ্যে ঘুমের ঘাটতি উদ্বেগজনকভাবে বাড়ছে। বিভিন্ন সমীক্ষায় দেখা গেছে, প্রায় ৮০–৯০ শতাংশ কিশোর-কিশোরী কোনো না কোনো মাত্রায় ঘুমের অভাবে ভোগে। এর প্রধান কারণ পড়াশোনার চাপ এবং রাত জেগে স্মার্টফোন ব্যবহার।

জাতীয় অপরাধ নথি ব্যুরোর তথ্য অনুযায়ী, ভারতে আত্মহত্যার সংখ্যা গত দশকে উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। ২০১৩ সালে যেখানে মোট আত্মহত্যার সংখ্যা ছিল ১,৩৪,৭৯৯, ২০২৩ সালে তা বেড়ে হয়েছে ১,৭১,৪১৮। একই সময়ে ছাত্রছাত্রীদের আত্মহত্যার সংখ্যাও প্রায় ৬৫ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে

সমাধানের পথ

বিশেষজ্ঞদের মতে, মানসিক স্বাস্থ্য মূল্যায়নের সময় কিশোর-কিশোরীদের ঘুমের অভ্যাসও পরীক্ষা করা জরুরি। অনিদ্রা, দেরিতে ঘুমানো এবং দীর্ঘদিনের ঘুমের ঘাটতি শনাক্ত করা গেলে অনেক সমস্যা আগেভাগেই প্রতিরোধ করা সম্ভব।

ঘুমের মান উন্নত করতে কয়েকটি সহজ নিয়ম মেনে চলার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে, যেমন—

৩:২:১ নিয়ম

  • ঘুমানোর ৩ ঘণ্টা আগে ভারী খাবার এড়িয়ে চলা

  • ঘুমানোর ২ ঘণ্টা আগে কাজ বা মানসিক চাপ কমানো

  • ঘুমানোর ১ ঘণ্টা আগে মোবাইল ও স্ক্রিন ব্যবহার বন্ধ করা

বিশেষজ্ঞদের বক্তব্য

ডাঃ সৌরভ দাস বলেন,
“ঘুমের অভাব আজকের দিনে একটি বড় জনস্বাস্থ্য সমস্যা হয়ে উঠছে। পর্যাপ্ত ঘুম মানসিক স্থিতি, কর্মক্ষমতা এবং জীবনের সামগ্রিক মান উন্নত করার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।”

ডাঃ উত্তম আগরওয়াল জানান,
“ভাল ঘুম সুস্বাস্থ্যের অন্যতম ভিত্তি। ঘুমের স্বাস্থ্য সম্পর্কে সচেতনতা বৃদ্ধি এবং ঘুমের রোগের দ্রুত নির্ণয় মানুষের সামগ্রিক স্বাস্থ্য উন্নত করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।”

ঘুমের গুরুত্ব সম্পর্কে সচেতনতা

Calcutta Sleep Society এবং World Sleep Society যৌথভাবে ঘুমের স্বাস্থ্য নিয়ে গবেষণা, সচেতনতা ও শিক্ষা কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, শারীরিক ও মানসিক সুস্থতার জন্য ঘুমকে জীবনের একটি অপরিহার্য অংশ হিসেবে গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *